পুষ্টি ও অপুষ্টি
Table of Content:
পুষ্টি (Nutrition)
আমরা যেসব খাদ্যদ্রব্য আহার করি সেসব দেহে সরাসরি শোষিত হতে বা কাজে লাগতে পারে না। দেহের প্রয়োজন অনুযায়ী শোষিত হওয়ার জন্য পরিপাক ক্রিয়ার মাধ্যমে খাদ্যকে শোষণ উপযোগী সরল অণুতে পরিণত হতে হয়। যে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আহারকৃত খাদ্যের জটিল ও বৃহৎ অণুগুলো পরিপাক হয়ে সরল অণুতে পরিণত হয়ে দেহকোষে শোষিত হয় এবং অপ্রয়োজনীয় অংশ দেহ হতে নির্গত হয়ে যায় তাকে পুষ্টি প্রক্রিয়া বলে। এক কথায়, পুষ্টি হলো একটি জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে আহারকৃত খাদ্যবস্তু দেহের কাজের ব্যবহৃত হয়। পুষ্টি প্রক্রিয়া চলতে থাকে বলেই গঠন, বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ, তাপ ও শক্তি উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ কার্যাদি সম্পাদন করে দেহ সুস্থ, সবল, কর্মক্ষম ও রোগমুক্ত থাকে।
অপুষ্টি (Malnutrition)
আমরা জানি যে, একেক ধরনের খাদ্য দেহে একেক ধরনের কাজ করে থাকে। এদের যেকোনোটির অভাবেই দেহে অপুষ্টি দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে, প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত বা অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে দেহে সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষণাদি প্রকাশ পায়। পুষ্টি প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার ফলেই দেহে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। একে অপুষ্টি বলে। সাধারণ অর্থে আমরা খাদ্য উপাদানের অপর্যাপ্ততার কারণে সৃষ্ট অভাবজনিত শারীরিক অবস্থাকে অপুষ্টি বলে চিহ্নিত করে থাকি। তবে, অপুষ্টি দু'ধরনের হতে পারে। ১। কমপুষ্টি (Under nutrition) ২। অতিপুষ্টি (Over nutrition)।
অপুষ্টি (Malnutrition)
👉 যখন শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি সঠিক পরিমাণে পায় না অথবা বেশি পায়, তখন তাকে অপুষ্টি বলে।
অপুষ্টি দুই প্রকার:
কমপুষ্টি (Under-nutrition)
👉 শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি হলে তাকে কমপুষ্টি বলে।
উদাহরণ:
-
🩸 রক্তস্বল্পতা (Anemia) – লৌহের অভাবে
-
🦋 গলগন্ড (Goitre) – আয়োডিনের অভাবে
-
👁️ রাতকানা (Night Blindness) – ভিটামিন A-এর অভাবে
-
⚖️ কম ওজন – পর্যাপ্ত খাদ্য না পাওয়ায়
📌 কারণ:
-
দারিদ্র্য
-
অপুষ্টিকর খাদ্য
-
অসচেতনতা
অতিপুষ্টি (Over-nutrition)
👉 যখন শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পুষ্টি গ্রহণ করা হয়।
উদাহরণ:
-
⚖️ স্থূলতা (Obesity)
-
🍬 ডায়াবেটিসের ঝুঁকি
-
❤️ হৃদরোগের ঝুঁকি
📌 কারণ:
-
অতিরিক্ত চর্বি ও ফাস্ট ফুড
-
কম শারীরিক পরিশ্রম
খাদ্য ও পুষ্টি শিক্ষার গুরুত্ব
বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য একটি অনিবার্য বিষয়। অথচ বিশ্বের অনুন্নত, স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্যাভাবে সৃষ্ট পুষ্টিহীনতা বা অপুষ্টি একটি মারাত্মক সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইদানীংকালে আমাদের দেশে পর্যাপ্ত শস্য উৎপন্ন হওয়ায় খাদ্যাভাব অনেকাংশেই দূর হয়েছে। তবে শুধু দারিদ্র বা খাদ্যাভাবই নয় বরং পুষ্টিজ্ঞান ও সচেতনতার অভাবে জনগণ অপুষ্টির শিকার হয়। রাতকানা, গলগন্ড, এনিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা, ঠোঁটের কোণায় ঘা, চর্মরোগ, পেটের পীড়া ইত্যাদি এদেশের মানুষের সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। খাদ্য ও পুষ্টির ঘাটতিজনিত সমস্যা হতে মুক্তি পেতে খাদ্য ও পুষ্টি শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। নিচে খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ক শিক্ষার গুরুত্ব আলোচনা করা হল।
১। খাদ্য উপাদান সম্পর্কে জ্ঞান: খাদ্য উপাদানসমূহের উৎস, কাজ ও অভাবজনিত অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। এ জ্ঞান ব্যক্তিগত ও জাতীয় স্বার্থে প্রয়োগ করা গেলে পরিবার হতে দেশ পর্যন্ত সবাই উপকৃত হবে।
২। পুষ্টি চাহিদা নির্ণয়: পুষ্টি চাহিদা নির্ণয় করে সে অনুযায়ী খাদ্য ব্যবস্থাপনা করা যায়। বয়স, লিঙ্গ, শ্রমের ধরন, শারীরিক অবস্থা, কাজের প্রকৃতি ইত্যাদি বিবেচনা করে পুষ্টি চাহিদা নির্ণয় করা গেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। ফলে যে কোনো ব্যক্তির জন্য যথার্থ পরিমাণের খাদ্য উপাদান সরবরাহ করা যায়।
৩। খাদ্য নির্বাচনে: খাদ্য নির্বাচনে পুষ্টি জ্ঞান প্রয়োগ করলে তা ব্যক্তিগত ও জাতীয় পর্যায়ে সুস্বাস্থ্য রক্ষার নিয়ামক হতে পারে।
৪। রন্ধন পদ্ধতি: খাদ্য উপাদান বিশেষে সঠিক রন্ধন পদ্ধতি সম্পর্কে খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞানে আলোচনা করা হয়। এ থেকে কোন ধরনের খাদ্য উপাদান কোন পদ্ধতিতে রন্ধন করলে পুষ্টিগুণ বজায় থাকে তা জানা যায়। এতে পুষ্টিমূল্যের অপচয় হয় না।
৫। সাশ্রয়ী মূল্যে সঠিক পুষ্টি: সাশ্রয়ী মূল্যে সঠিক পুষ্টি পেতে খাদ্য ও পুষ্টিজ্ঞানের প্রয়োজন হয়। সহজ লভ্য ও সুলভে, উচ্চ ও অধিক পুষ্টিমানবিশিষ্ট খাদ্যদ্রব্য বাছাই করতে এ জ্ঞান কাজে লাগানো যায়।
৬। মায়ের দুধের পুষ্টিমূল্য: মায়ের প্রথম শালদুধ ও মায়ের দুধের অমূল্য পুষ্টিগুণ শিশুর জন্য কতটা জরুরি তা খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান পাঠের মাধ্যমে জানা যায়। শাল দুধ শিশুর জন্য প্রথম টিকা। অর্থাৎ, শাল দুধ শিশু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে এবং মায়ের দুধই শিশুর আদর্শ খাদ্য। এ সম্পর্কিত জ্ঞান ও প্রচারণা দেশ ও জাতির জন্য অতি
৭। সুষম খাদ্য ও মৌলিক খাদ্যগোষ্ঠী। বিশেষ করে পারিবারিক পরিমন্ডলে সুষম খাদ্য ও মৌলিক খাদ্যগোষ্ঠী সম্পর্কিত জ্ঞান স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
৮। পথ্য সম্পর্কিত জ্ঞান। খাদ্য ও পুষ্টি শিক্ষার মাধ্যমে পথ্য নির্ভর রোগ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানা যায়। এতে পথ্য নির্ভর রোগ সহজেই উপশম করা যায়।
১। রোগ প্রতিরোধ। বিভিন্ন ধরনের রোগের উৎস ও কারণ নিয়ে পুষ্টি বিজ্ঞানে আলোচনা করা হয় বলে এ জ্ঞান রোগ প্রতিরোধে বিশেষভাবে কাজে আসে।
১০। কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা প্রতিরোধ। পুষ্টি, খাদ্য, রোগ, পথা ইত্যাদি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ও সঠিক ধারণা গড়ে ওঠে বলে প্রচলিত কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা প্রতিহত করা যায়। এর ফলে সার্বিক পুষ্টি অবস্থার উন্নতি ঘটানো সম্ভব হয়।