প্রোটিন বা আমিষ
Table of Content:
প্রোটিন
দেহ গঠনে প্রোটিনের প্রয়োজনীয়তা সর্বাধিক। মানবদেহের মাংসপেশি, অস্থি, রক্ত ইত্যাদি গঠনের প্রধান উপাদান প্রোটিন। দেহের অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপ তথা জৈব বিক্রিয়ার হার নিয়ন্ত্রণকারী প্রভাবক বা এনজাইমসমূহ প্রোটিন দিয়ে গঠিত। এমনকি দেহকোষসমূহ প্রোটিন সমন্বয়ে তৈরি হয়। তাই, খাদ্য উপাদানগুলোর মধ্যে প্রোটিন অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি।
প্রোটিনের গঠন
প্রোটিনকে ভাঙলে বা সম্পূর্ণরূপে আর্দ্র বিশ্লেষিত করলে কার্বন (C), হাইড্রোজেন (H), অক্সিজেন (০) ও নাইট্রোজেন (N) মৌল পাওয়া যায়। কোনো কোনো প্রোটিনে সালফার, ফসফরাস ও লৌহের সামান্য উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তবে প্রোটিনের মূল গঠন উপাদান হলো কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন। এ চারটি মৌল মিলিত হয়ে প্রথমে এ্যামাইনো এসিড এবং পরে এ্যামাইনো এসিডগুলো পেপটাইট বন্ধনী দিয়ে সংযুক্ত হয়ে প্রোটিন অণু গঠিত হয়। অর্থাৎ, প্রোটিন হলো এ্যামাইনো এসিডের পলিমার।
প্রোটিনের শ্রেণিবিভাগ
প্রোটিনে এ্যামাইনো এসিড ও অন্যান্য উপাদানের উপস্থিতির উপর ভিত্তি করে প্রোটিনকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
যথা:
১। সরল প্রোটিন ২। যৌগিক প্রোটিন ও ৩। উদ্ভুত প্রোটিন।
১। সরল প্রোটিন: যেসব প্রোটিনকে আর্দ্র বিশ্লেষণ করলে শুধুমাত্র এ্যামাইনো এসিড পাওয়া যায় অর্থাৎ এ্যামাইনো এসিড ছাড়া অন্য কোনো উপাদান পাওয়া যায় না তাদের সরল প্রোটিন বলে। যেমন- এলবুমিন, গ্লোবিউলিন, গুটেনিন, প্রোলামিন, হিস্টোন ইত্যাদি।
২। যৌগিক প্রোটিন: যেসব প্রোটিনকে আর্দ্র বিশ্লেষণ করলে এ্যামাইনো এসিড ছাড়াও অন্যান্য অপ্রোটিন উপাদান পাওয়া যায় তাদের যৌগিক প্রোটিন বলে। যেমন- ফসফোপ্রোটিন, লাইপোপ্রোটিন, নিউক্লিওপ্রোটিন, গ্লাইকোপ্রোটিন ইত্যাদি। প্রোটিনের সাথে সংযুক্ত অপ্রোটিন অংশের নামানুসারে এদের নামকরণ করা হয়। উদাহরণ স্বরূপ- প্রোটিনের সাথে ফসফেট যুক্ত থাকে বলে ফসফোপ্রোটিন। প্রোটিনের সাথে নিউক্লিয়িক এসিড যুক্ত থাকলে নিউক্লিওপ্রোটিন। এভাবে লিপিড যুক্ত থাকলে লাইপোপ্রোটিন ইত্যাদি। এদের সংযুক্ত প্রোটিনও বলা হয়ে থাকে।
৩। উদ্ভুত প্রোটিন: সরল ও যৌগিক প্রোটিনের সমন্বয়ে গঠিত প্রোটিনকে উদ্ভুত প্রোটিন বলে। যেমন- পেপটাইডসমূহ, পেপটোন, প্রোটিওজ ইত্যাদি।
প্রোটিনে অত্যাবশ্যকীয় এ্যামাইনো এসিডের উপস্থিতির উপর ভিত্তি করে প্রোটিনকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা: ১। সম্পূর্ণ প্রোটিন, ২। অসম্পূর্ণ প্রোটিন।
১। সম্পূর্ণ প্রোটিন: যে প্রোটিনে সবকটি অত্যাবশ্যকীয় এ্যামাইনো এসিড থাকে তাকে সম্পূর্ণ প্রোটিন বলে। এদের পুষ্টিমান উন্নত। যেমন- ডিম ও দুধের প্রোটিন। সাধারণত প্রাণিজ প্রোটিনগুলো সম্পূর্ণ প্রোটিন হয়।
২। অসম্পূর্ণ প্রোটিন: যে প্রোটিনে এক বা একাধিক অত্যাবশ্যকীয় এ্যামাইনো এসিডের ঘাটতি থাকে তাকে অসম্পূর্ণ প্রোটিন বলে। এসব প্রোটিনের পুষ্টিমান নিম্নমানের। যেমন- চাল, গম ও বিচির প্রোটিন। সাধারণত উদ্ভিজ্জ প্রোটিনগুলো অসম্পূর্ণ প্রোটিন হয়।
এ্যামাইনো এসিড
বহু সংখ্যক এ্যামাইনো এসিড পরস্পর পেপটাইড বন্ধনী দিযে যুক্ত হয়ে প্রোটিন গঠিত হয়। প্রকৃতিতে প্রায় ২০/২২ ধরনের এ্যামাইনো এসিড আবিষ্কৃত হয়েছে। এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক এ্যামাইনো এসিড আমাদের দেহেই তৈরি হয়।
অত্যাবশ্যকীয় এ্যামাইনো এসিড: কতগুলো এ্যামাইনো এসিড আমাদের দেহ তৈরি করতে পারে না। অথচ এগুলো দেহের
জন্য অত্যাবশ্যক। তাই এদের খাদ্যের মাধ্যমে দেহে সরবরাহ করতে হয়। এদেরকে অত্যাবশ্যকীয় এ্যামাইনো এসিড বলে। প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য ৮টি এবং শিশুদের জন্য ১০টি অত্যাবশ্যকীয় এ্যামাইনো এসিড খাদ্যের মাধ্যমে দেহে যোগান দিতে হয়। এগুলো হলো-
১। মিথিওনিন (Methionine)
২। আইসোলিউসিন (Isoleucine)
৩। লিউসিন (Leucine)
৪। ফিনাইল এলানিন (Phenylalanine)
৫। থ্রিওনিন (Threonine)
৬। ট্রিপটোফ্যান (Tryptophan)
৭। লাইসিন (Lysine)
৮। ভ্যালিন (Valine)
৯। হিস্টিডিন (Histidine) শুধুমাত্র শিশুদের জন্য
১০। আরজিনিন (Arginine)- শুধুমাত্র শিশুদের জন্য
অনাবশ্যকীয় এ্যামাইনো এসিড: দেহের জন্য প্রয়োজনীয় যেসব এ্যামাইনো এসিড দেহেই তৈরি হতে পারে তাদের অনাবশ্যকীয় এ্যামাইনো এসিড বলে। যেমন- গ্লাইসিন, এলানিন, এসপারটিক এসিড, সেরিন, গ্লুটামিক এসিড ইত্যাদি।
প্রোটিনের কাজ
প্রোটিনের কাজ: গ্রিক শব্দ প্রোটিওস থেকে প্রোটিন শব্দটির উৎপত্তি। যার অর্থ হলো- প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ। মানবদেহের প্রধান গঠন উপাদানই হলো- প্রোটিন। দেহে প্রোটিনের কাজ ও ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন-
১। প্রোটিনের প্রধান কাজ হলো দেহ গঠন, বৃদ্ধি সাধন ও ক্ষয়পূরণ করা। মানবদেহের পেশি, অস্থি, রক্তের হিমোগ্লোবিনের অন্যতম প্রধান গঠন উপাদান হলো প্রোটিন। এছাড়া, দাঁত, নখ, চুল প্রভৃতির অন্যতম গঠন উপাদান প্রোটিন।
২। হরমোন ও এনজাইমসমূহ প্রোটিন দিয়ে তৈরি, যা দেহের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণে কাজ করে।
৩। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে প্রোটিন দেহে জীবাণু ধ্বংসকারী অ্যান্টিবডি ও অ্যান্টিজেন তৈরি করে।
৪। দেহে তাপ ও শক্তি উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত শর্করা ও স্নেহ পদার্থের অভাব হলে প্রোটিন ভেঙ্গে তাপ ও শক্তি উৎপন্ন হয়।
৫। প্রোটিন দেহে পানির সমতা বজায় রাখে।
৬। প্রোটিন রক্তের অম্ল ও ক্ষারের সমতা নিয়ন্ত্রণ করে।
৭। খাদ্য পরিপাকে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন জারক রস, যেমন- পেপসিন, ট্রিপসিন ইত্যাদি প্রোটিন দিয়ে তৈরি হয়।
৮। দেহের ক্ষতস্থান হতে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে প্রোটিন দিয়ে তৈরি ফিব্রিন কাজ করে।
৯। ত্বক ও চুলের স্বাভাবিক রং বজায় রাখতে প্রোটিন সাহায্য করে।
১০। শিশুর মানসিক বিকাশে প্রোটিন সাহায্য করে।
প্রোটিনের উৎস
প্রোটিনের উৎস: উৎস অনুসারে প্রোটিন ২ প্রকার। যথা: ১। প্রাণিজ প্রোটিন ও ২। উদ্ভিজ্জ প্রোটিন।
১। প্রাণিজ প্রোটিন: প্রাণি থেকে প্রাপ্ত প্রোটিনসমূহকে প্রাণিজ প্রোটিন বলে। যেমন- মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, পনির ছানা, কলিজা ইত্যাদি। প্রাণিজ প্রোটিনে সবকটি অত্যাবশ্যকীয় এ্যামাইনো এসিড থাকে বলে এদের গুণগত মান উন্নত। এদের সম্পূর্ণ প্রোটিনও বলা হয়।
২। উদ্ভিজ্জ প্রোটিন: উদ্ভিদ থেকে প্রাপ্ত প্রোটিনকে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন বলে। যেমন- সব ধরনের ডাল, সব ধরনের বাদাম, সয়াবিন, শিমের বিচি, মটরশুঁটি, কাঁঠালের বিচি, সবজির বিচি ইত্যাদি। উদ্ভিদ হতে প্রাপ্ত প্রোটিনের গুণগত মান উন্নত নয়। কারণ এতে এক বা একাধিক অত্যাবশ্যকীয় এ্যামাইনো এসিডের ঘাটতি থাকে।