আসক্তির শৃঙ্খলে আটকে যাওয়া: ডিজিটাল আসক্তির বাস্তব চিত্র

Rumman Ansari   2025-12-29   Developer   youth society > ডিজিটাল আসক্তি   12 Share

আসক্তির শৃঙ্খলে আটকে যাওয়া: ডিজিটাল আসক্তির বাস্তব চিত্র

ভূমিকা

বর্তমান যুগে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তথ্য সংগ্রহ, শিক্ষা, যোগাযোগ কিংবা বিনোদন—সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে এক ভয়ংকর অভ্যাস—ডিজিটাল আসক্তি। অজান্তেই মানুষ বন্দি হয়ে পড়ছে স্ক্রিনের ভেতরের এক কৃত্রিম জগতে, যা বাস্তব জীবনের উপর ফেলছে মারাত্মক প্রভাব।


ডিজিটাল আসক্তি কী?

ডিজিটাল আসক্তি বলতে বোঝায়—মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন গেমের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা, যার ফলে ব্যক্তি নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এই আসক্তি ধীরে ধীরে মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে।


ডিজিটাল আসক্তির সাধারণ লক্ষণসমূহ

নিচের লক্ষণগুলো লক্ষ্য করলে বুঝতে হবে ব্যক্তি ডিজিটাল আসক্তির পথে এগোচ্ছে—

  1. প্রয়োজন ছাড়াই বারবার ফোন হাতে নেওয়া

  2. দীর্ঘ সময় স্ক্রল করা এবং সময়ের হিসাব না থাকা

  3. ঘনঘন নোটিফিকেশন চেক করা

  4. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন আপডেট দেখার তীব্র আগ্রহ

  5. গেম বা অনলাইন অ্যাপে অতিরিক্ত সময় ব্যয়

  6. ফোন ছাড়া অস্বস্তি, বিরক্তি বা উৎকণ্ঠা অনুভব করা

  7. পরিবার বা কাজের সময়েও ফোন ব্যবহার

  8. শিশু ও শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পড়াশোনায় অনীহা


ডিজিটাল আসক্তির প্রভাব

১. মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব

ডিজিটাল আসক্তি মানুষের মনোজগতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। এর ফলে—

  • দুশ্চিন্তা, হতাশা ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়

  • ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়

  • আত্মসম্মানবোধ কমে যায়

  • একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি জন্ম নেয়

  • মানসিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়

মন ভালো থাকলে শরীরও ভালো থাকে। কিন্তু আসক্তি মনকে দুর্বল করে তোলে এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নষ্ট করে দেয়।


২. শারীরিক ক্ষতি

অতিরিক্ত মোবাইল বা স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে দেখা দিতে পারে—

  • চোখের জ্বালা, চোখে চাপ ও দৃষ্টিশক্তির সমস্যা

  • ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা (স্মার্টফোন নেক সিনড্রোম)

  • ঘুমের ব্যাঘাত, অনিদ্রা

  • শারীরিক কর্মক্ষমতা হ্রাস

  • ফিটনেস কমে যাওয়া

বিশেষ করে রাতে ফোন ব্যবহারের ফলে মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন কমে যায়, যা ঘুমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


৩. শিক্ষাগত ও কর্মজীবনে প্রভাব

ডিজিটাল আসক্তি শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর—

  • মনোযোগ ও একাগ্রতা কমে যায়

  • পড়াশোনা বা কাজে আগ্রহ হারায়

  • ফলাফল ও উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়

  • সময় ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ে

শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এটি একাডেমিক ব্যর্থতার বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।


৪. সামাজিক ও পারিবারিক প্রভাব

ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকার ফলে বাস্তব সম্পর্কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়—

  • পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়

  • সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়

  • পারিবারিক দায়িত্ব অবহেলা করা শুরু হয়

  • সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব ও ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে

একসময় মানুষ বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে।


ডিজিটাল আসক্তি থেকে মুক্তির উপায়

ডিজিটাল আসক্তি একটি নেশার মতো। তবে সচেতন হলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

১. সময়সীমা নির্ধারণ

প্রতিদিন কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করবেন তা নির্দিষ্ট করুন এবং নিজেকে সেই সীমার মধ্যে রাখার চেষ্টা করুন।

২. অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা

অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখলে বারবার ফোন দেখার প্রবণতা কমবে।

৩. ডিজিটাল ডিটক্স

সপ্তাহে অন্তত একদিন বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ও ফোন ব্যবহার থেকে বিরতি নিন।

৪. শারীরিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ

নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম, খেলাধুলা বা যোগব্যায়াম মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

৫. সামাজিক সম্পর্ক জোরদার করা

পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটান। মুখোমুখি কথোপকথন মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।


উপসংহার

প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করেছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রযুক্তির দাস হয়ে গেলে সেই সুবিধাই অভিশাপে পরিণত হয়। ডিজিটাল আসক্তি ধীরে ধীরে মানুষকে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তাই এখনই সময়—নিজেকে সচেতন করার, প্রয়োজনের বাইরে প্রযুক্তি ব্যবহার কমানোর এবং ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনে ফিরে আসার।

মনে রাখবেন, আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করব—প্রযুক্তি যেন আমাদের ব্যবহার না করে।