- Aদিন
- Bসকাল
- Cরাত
- Dবিকেল
Time Taken:
Correct Answer:
Wrong Answer:
Percentage: %
কুরআন ও হাদীসে কোথাও "লাইলাতুল বারাআত” পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয় নি। সাহাবী-তাবিয়ীগণের যুগেও এ পরিভাষাটির ব্যবহার জানা যায় না। এ রাতটিকে হাদীস শরীফে "লাইলাতুন নিসফি মিন শা'বান" বা "মধ্য-শা'বানের রজনী" বলা হয়েছে। সাহাবী- তাবিয়ীগণের যুগের অনেক পরে এ রাতটিকে "লাইলাতুল বারাআত" বা "বিমুক্তির রজনী" বলে আখ্যায়িত করার প্রচলন দেখা দেয়। আমরা জানি, পরিভাষার বিষয়টি প্রশস্ত, তবে মুমিনের জন্য সর্বদা কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবীগণের ব্যবহৃত পরিভাষা ব্যবহার করাই উত্তম। সাধারণ পাঠকের সহজবোধ্যতার জন্য আমরা মাঝে মাঝে "শবে বরাত" বা "লাইলাতুল বারাআত” পরিভাষা ব্যবহার করলেও সাধারণভাবে আমরা এ গ্রন্থে "শবে বরাত” বুঝাতে "শাবান মাসের মধ্যম রজনী" বা "মধ্য-শাবানের রজনী" পরিভাষা ব্যবহার করব।
এভাবে আমরা দেখছি যে, কুরআন কারীমে 'শবে-বরাত' বা 'লাইলাতুন নিসফি মিন শা'বান' সম্পর্কে কোনোরূপ নির্দেশনা নেই। তবে এ বিষয়ে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। মধ্য শা'বানের রজনী বা শবে বরাত সম্পর্কে প্রচলিত হাদীসগুলিকে সেগুলির অর্থ ও নির্দেশনার
আলোকে সাত ভাগে ভাগ করা যায়:
১. সাধারণ ফযীলতের হাদীস, যেগুলিতে কোনো আমলের কথা উল্লেখ নেই।
২. উক্ত রাতে হায়াত মওত ও রিযক নির্দ্ধারণ বিষয়ক হাদীস।
৩. এ রাতে দোয়া-মুনাজাত করতে উৎসাহজ্ঞাপক হাদীস।
৪. এ রাতে অনির্ধারিতভাবে সালাত আদায়ে উৎসাহজ্ঞাপক হাদীস।
৫. নির্ধারিত রাক'আত সালাত নির্ধারিত পদ্ধতিতে আদায়ে উৎসাহজ্ঞাপক হাদীস।
৬. সনদ বিহীন কিছু প্রচলিত কথা।
৭. উক্ত রাত সম্বন্ধে সাহাবা ও তাবেয়ীগণের পক্ষ থেকে কতিপয় বক্তব্য ও আমল।
আউফ ইবনু মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন:
يَطَّلِعُ اللَّهُ عَلَى خَلْقِهِ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لَهُمْ كُلِّهِمْ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ
"মহান আল্লাহ্ মধ্য শা'বানের রাতে সৃষ্টির প্রতি দৃকপাত করেন। অতঃপর শিরকে লিপ্ত অথবা বিদ্বেষে লিপ্ত ব্যতীত সকলকে মাফ করে দেন।"
এ হাদীসটি আবু বকর আহমদ বিন আমর আল বাযযার তাঁর সনদে ইবনু লাহীয়া থেকে, তিনি তাঁর শায়খ আব্দুর রহমান বিন যিয়াদ বিন আনউম থেকে, তিনি তাঁর সনদে আউফ বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণনা করেন। ২৪
এই সনদটিও ইবনু লাহীয়া ও তার শায়খ আব্দুর রহমানের দূর্বলতার কারণে দূর্বল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হাফিয নূরুদ্দীন আলী বিন আবি বকর আল-হায়সামী (৮০৭ হি) বলেন: "এ সনদের মধ্যে আব্দুর রহমান বিন যিয়াদ বিন আনউমকে আহমদ বিন সালেহ নির্ভরযোগ্য বলেছেন, পক্ষান্তরে অধিকাংশ ইমাম তাকে দুর্বল হিসেবে অভিহিত করেছেন। আর ইবনু লাহীয়াও দুর্বল। এছাড়া সনদের অন্যান্য রাবীগণ নির্ভরযোগ্য। ২৫
“যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে প্রত্যেক রাকাতে ৩০বার সুরা ইখলাস পাঠের মাধ্যমে ৩০০ রাকাত সালাত আদায় করবে জাহান্নামের আগুন অবধারিত এমন ১০ ব্যক্তির ব্যপারে তার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।" হাদীসটি আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম বাতিল বা ভিত্তিহীন হাদীস সমূহের মধ্যে উলেখ করেছেন।
মধ্য শাবানের রজনীতে এ পদ্ধতিতে সালাত আদায়ের প্রচলন হিজরী চতুর্থ শতকের পরে মানুষের মধ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করে। মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন যে, ৪৪৮ হি. সনে বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রথম এ রাত্রিতে এ পদ্ধতিতে সালাত আদায়ের প্রচলন শুরু হয়। এ সময়ে বিভিন্ন মিথ্যাবাদী গল্পকার ওয়ায়েয এ অর্থে কিছু হাদীস বানিয়ে বলেন। এ অর্থে ৪টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যার প্রত্যেকটিই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
প্রচলিত সনদ-বিহীন কথাগুলির অন্যতম হলো এ রাতে গোসল করার ফযীলত। বিষয়টি যদিও ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা, তবুও আমাদের সমাজে তা ব্যাপক প্রচলিত। আমদের দেশের প্রচলিত প্রায় সকল পুস্তকেই এ জাল কথাটি লিখা হয় এবং ওয়াযে আলোচনায় বলা হয়। প্রচলিত একটি বই থেকে উদ্ধৃত করছি: "একটি হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি উক্ত রাত্রিতে এবাদতের উদ্দেশ্যে সন্ধ্যায় গোসল করিবে, সে ব্যক্তির গোসলের প্রত্যেকটি বিন্দু পানির পরিবর্তে তাহার আমল নামায় ৭০০ (সাতশত) রাকাত নফল নামাযের ছওয়াব লিখা যাইবে। গোসল ,, করিয়া দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল অজুর নামায পড়িবে।..."
এ মিথ্যা কথাটি দ্বারা প্রভাবিত ও প্রতারিত হয়ে কঠিন শীতের রাতেও অনেকে গোসল করেন। উপরন্তু ফোটা ফোটা পানি পড়ার আশায় শরীর ও মাথা ভাল করে মোছেন না। এর ফলে অনেকে, বিশেষত, মহিলারা ঠাণ্ডা-সর্দিতে আক্রান্ত হন। আর এ কষ্ট শরীয়তের দৃষ্টিতে বেকার পণ্ডশ্রম ছাড়া কিছুই নয়। কারণ, সুন্নাতের আলোকে এ রাতে গোসল করে ইবাদত করা আর ওযু করে ইবাদত করার মধ্যে কোনোরূপ পার্থক্য নেই। অনুরূপভাবে এ রাতে গোসল করা এবং অন্য কোনো রাতে গোসল করার মধ্যেও কোনো পার্থক্য নেই।
এ রত্রিতে হালুয়া-রুটি তৈরি করা, খাওয়া, বিতরণ করা ইত্যাদি সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কর্ম। এ রাত্রিতে এ সকল কর্ম করলে কোনো বিশেষ সাওয়াব পাওয়া যাবে মর্মে কোনো হাদীস বর্ণিত হয় নি। এ বিষয়ে ফুরফুরার পীর আল্লামা আবু জাফর সিদ্দীকী তাঁর লেখা "আল-মাউযূআত” গ্রন্থে বলেন: “মুর্খ লোকেরা বলে যে, 'রাসূলুল্লাহ যখন উহদ যুদ্ধে আহত হন এবং তাঁর মুবারক দাঁত ভেঙ্গে যায় তখন তিনি হালুয়া খেয়েছিলেন। এজন্য শবে বারাতে হালুয়া বানতে হয়।' কথাটি ভুল। আর উহদের যুদ্ধ শাওয়াল মাসে ঘটেছিল।"
১৫ই শা'বানের দিনে সিয়াম
প্রতি আরবী মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ সিয়াম পালন সুন্নাত নির্দেশিত গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত। এছাড়া রাসূলুল্লাহ )ﷺ( শাবান মাসে বেশি বেশি সিয়াম পালন করতেন। সাধারণত তিনি শাবানের প্রথম থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত রোযা রাখতেন এবং অনেক সময় প্রায় পুরো শাবানই সিয়ামরত থাকতেন। এজন্য শাবানের প্রথম থেকে ১৫ তারিখ অথবা অন্তত ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ সিয়াম পালন সুন্নাত সম্মত গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল। তবে শুধু ১৫ই শাবান সিয়াম পালনের বিষয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য হাদীস পাওয়া যায় না। আলী (রা) থেকে বর্ণিত (১৭ নং) হাদীসে এ দিনে সিয়ামের কথা বলা হয়েছে। তবে হাদীসটির সনদ নির্ভরযোগ্য নয়। ১৪ রাক'আত বিষয়ক (৩২ নং) হাদীসেও সিয়াম পালনের ফযীলত উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু হাদীসটি জাল। এ বিষয়ক আরেকটি সনদবিহীন কথা:
مَنْ صَامَ يَوْمَ خَامِسَ عَشَرَ شَعْبَانَ لَمْ تَمْسَسْهُ النَّارُ أَبَداً
“যে ব্যক্তি শাবান মাসের ১৫ তারিখে সিয়াম পালন করবে, জাহান্নামের আগুন কখনোই তাকে স্পর্শ করবে না।"