Table of Contents

    ফ্যাট বা স্নেহ পদার্থ

    প্রধান খাদ্য উপাদান তিনটির মধ্যে ফ্যাট বা স্নেহ পদার্থ অন্যতম। মূলত তেল (oil) ও চর্বিকে (fat) একত্রে স্নেহ পদার্থ বলা হয়। অনেক সময় তেল ও চর্বিকে লিপিডও (Lipid) বলা হয়। উদ্ভিজ্জ উৎস হতে প্রাপ্ত ফ্যাট বা স্নেহ পদার্থগুলো তেল (oil) এবং প্রাণিজ উৎস হতে প্রাপ্ত ফ্যাট বা স্নেহ পদার্থগুলো চর্বি (fat) বলা হয়। স্নেহ পদার্থ হতে সর্বাধিক পরিমাণ শক্তি পাওয়া যায়। ১ গ্রাম ফ্যাট হতে ৯ কিলোক্যালরি শক্তি উৎপন্ন হয়।

    ফ্যাটের গঠন

    ১ অণু গ্লিসেরলের সাথে ৩ অণু ফ্যাটি এসিড যুক্ত হয়ে ফ্যাটের অণু গঠিত হয়। গ্লিসেরল হলো এক প্রকার এ্যালকোহল এবং ফ্যাটি এসিড হলো এক প্রকার জৈব এসিড। ফ্যাটের বিশ্লেষণে কার্বন (c), হাইড্রোজেন (H) ও অক্সিজেন (০) পাওয়া যায়।


    ফ্যাটের শ্রেণিবিভাগ

    গঠন প্রকৃতির উপর নির্ভর করে ফ্যাটকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। যথা: ১। সরল ফ্যাট, ২। যৌগিক ফ্যাট ও ৩।

    উদ্ভুত ফ্যাট।

    ১। সরল ফ্যাট (Simple fat): যেসব স্নেহ পদার্থ ভাঙলে কেবল গ্লিসেরল ও ফ্যাটি এসিড পাওয়া যায় তাকে সরল ফ্যাট বলে। ত্বকের নিচে, যকৃত ও মেদকলায় সরল ফ্যাট থাকে।

    ২। যৌগিক ফ্যাট (Compound fat): যেসব ফ্যাট বিশ্লেষণ করলে গ্লিসেরল ও ফ্যাটি এসিড ছাড়াও অন্যান্য উপাদান

    যেমন- ফসফরাস, শর্করা, প্রোটিন ইত্যাদি পাওয়া যায় তাদের যৌগিক ফ্যাট বলে। ফসফোলিপিড, গ্লাইকোলিপিড, লাইপোপ্রোটিন ইত্যাদি যৌগিক ফ্যাট। ফসফরাস যুক্ত ফ্যাট হলো ফসফোলিপিড, শর্করা যুক্ত ফ্যাট গ্লাইকোলিপিড, প্রোটিনযুক্ত ফ্যাট লাইপোপ্রোটিন ইত্যাদি। মানবদেহের কোষ ঝিল্লী, মগজ ইত্যাদিতে যৌগিক ফ্যাট পাওয়া যায়।

    ৩। উদ্ভুত ফ্যাট (Derived fat): সরল ও যৌগিক ফ্যাট হতে উৎপন্ন কিছু জটিল চক্রাকার আকৃতির উপাদানসমূহকে উদ্ভুত ফ্যাট বলা হয়। যেমন- কোলেস্টেরল। কোষ ঝিল্লীর প্রধান গঠন উপাদান কোলেস্টেরল। কোলেস্টেরল হতে কোনো শক্তি উৎপন্ন হয় না।


    ফ্যাটি এসিড

    স্নেহ পদার্থের প্রধান অংশ ফ্যাটি এসিড। ফ্যাটি এসিডের প্রকৃতির উপর ফ্যাটের বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে। প্রকৃতিতে প্রায় ৪০ প্রকারের ফ্যাটি এসিডের সন্ধান পাওয়া গেছে। ফ্যাটি এসিড একটি জৈব এসিড যাতে ৪-১৪ টি কার্বন থাকে। ফ্যাটি এসিড ২ ধরনের হয়ে থাকে ১। অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড এবং ২। সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড।

    ১। অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড (Unsaturated fatty acid): যেসব ফ্যাটি এসিডের কার্বন অণুতে আরও হাইড্রোজেন অণু

    যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকে তাদের অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড বলে। সামুদ্রিক মাছের তেলে অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড থাকে। যেমন- কড মাছের তেল।

    ২। সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড (Saturated fatty acid): যেসব ফ্যাটি এসিডের কার্বন অণু পরিপূর্ণভাবে হাইড্রোজেন দিয়ে

    সম্পৃক্ত থাকে, আর কোনো হাইড্রোজেন গ্রহণের সুযোগ থাকে না তাদের সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড বলে। যেমন- চর্বি, মাখন, ডালডা ইত্যাদি।

    অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড (Essential fatty acid): যেসব ফ্যাটি এসিড দেহে তৈরি হতে পারে না অথচ এদের দেহের যথেষ্ট পুষ্টিগত গুরুত্ব আছে এবং এদের অভাবে দেহের কার্যাবলি বিঘ্নিত হয় তাদের অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড বলে।

    অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড ৩টি। এগুলো হলো-

    ১। লিনোলেইক এসিড (Linoleic acid): ডিমের কুসুম, বাদাম, সয়াবিন তেলে পাওয়া যায়।

    ২। লিনোলিনিক এসিড (Linolenic acid): মাছের তেল, যকৃতে পাওয়া যায়।

    ৩। এ্যারাকিডনিক এসিড (Arachidonic acid): যকৃতের তেলে পাওয়া যায়।


    ফ্যাটের উৎস

    ফ্যাটের উৎস: ফ্যাট প্রাণি এবং উদ্ভিদ উভয় ধরনের উৎস থেকেই পাওয়া যায়।

    প্রাণিজ উৎস: মাংস ও বড় মাছের চর্বি, ঘি, মাখন, ডিমের কুসুম, দুধের সর, যকৃত, মগজ ইত্যাদি।

    উদ্ভিজ্জ উৎস: সয়াবিন তেল, সরিষার তেল, নারিকেল তেল, বাদাম তেল, চীনা বাদাম, কাজু বাদাম, বীজ তেল ইত্যাদি।


    ফ্যাট বা স্নেহের কাজ

    ১। ফ্যাট বা স্নেহ পদার্থের প্রধান কাজ-দেহের জন্য প্রয়োজনীয় তাপ ও শক্তি উৎপন্ন করা। প্রোটিন ও শর্করার তুলনায় ফ্যাট হতে সর্বাধিক শক্তি পাওয়া যায়। ১ গ্রাম ফ্যাট হতে ৯ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়।

    ২। ফ্যাট ত্বকের মসৃণতা, সৌন্দর্য ও চাকচিক্য বজায় রাখে।

    ৩। চর্মরোগ হতে রক্ষা পেতে ফ্যাট কাজ করে।

    ৪। ফ্যাটে দ্রবণীয় ভিটামিনসমূহ, যথা- ভিটামিন- এ, ডি, ই এবং কে দেহে শোষণের জন্য স্নেহপদার্থের উপস্থিতি I অপরিহার্য।

    ৫। দেহে শক্তির অভাব ঘটলে সঞ্চিত ফ্যাট ভেঙ্গে শক্তি উৎপন্ন হয়।

    ৬। দেহের বিভিন্ন অঙ্গ যেমন- হৃৎপিন্ড, ফুসফুস, কিডনি, লিভার ইত্যাদিকে ফ্যাট কুশনের মতো নিরাপদে রাখে ও আঘাত হতে রক্ষা করে।


    অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড বা স্নেহপদার্থের অভাবজনিত অবস্থা

    ১। ফ্যাটের অভাবে চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলো দেহে শোষিত হতে পারে না।

    ২। ত্বক শুষ্ক ও খসখসে হযে যায়।

    ৩। দেহের সৌন্দর্য হানি হয়।

    ৪। অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিডের অভাবে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ দেখা দেয়।

    ৫। শিশুদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় ও একজিমা দেখা দিতে পারে।


    অতিরিক্ত ফ্যাট গ্রহণের কুফল

    ১। দেহে চর্বির পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ও শরীর মেদবহুল হয়।

    ২। ওজনাধিক্য বা স্থূলতা (obesity) হয়।

    ৩। হৃদরোগসহ অন্যান্য জটিল রোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়ে।


    চাহিদা

    দেহের জন্য প্রয়োজনীয় মোট ক্যালরির ২০%-৩০% শক্তি ফ্যাট জাতীয় খাদ্য হতে গ্রহণ করতে হবে। গৃহীত স্নেহ জাতীয় খাদ্যের মধ্যে অবশ্যই অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড থাকতে হবে।