ভাষা
Table of Content:
শিশুর ভাষার বিকাশ
ভাষার বিকাশ মানব শিশুর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা হচ্ছে যোগাযোগের মাধ্যম ও ভাবের বাহন। শিশুর মানসিক এবং সামাজিক বিকাশ তার ভাষার বিকাশের উপর নির্ভর করে। শিশুর ব্যক্তিগত ও সামাজিক অভিযোজনে ভাষার গুরুত্ব অত্যধিক।
ভাষার বিকাশ একটি জটিল ও বিলম্বিত প্রক্রিয়া। সাধারণত শিশু বার থেকে পনের মাসের আগে তার প্রথম শব্দ উচ্চারণ করে না। এ সময় পর্যন্ত যোগাযোগের জন্য শিশুকে কান্না, অঙ্গভঙ্গি ইত্যাদি নানা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। শিশু কথা বলার আগে কথা বুঝতে পারে। শিশুর ভাষা বিকাশের ক্ষেত্রে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পর্যায় দেখা যায়। পর্যায়গুলো হচ্ছে ধ্বনি, কলকূজন, অঙ্গভঙ্গিমা, সহজশব্দ উচ্চরণ, এক শব্দে বাক্য গঠন, দু'তিন শব্দের বাক্য তৈরি ইত্যাদি।
ভাষার বিকাশ
শিশুর জীবনের প্রথম ধ্বনি হচ্ছে কান্না। নবজাতকের অর্থহীন কান্নাই হচ্ছে ভাষার বিকাশের প্রথম ধাপ। নবজাতক কান্নার মাধ্যমে অন্যের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। তার চাহিদা জানায়। প্রথমে এই কান্না হয় সাধারণধর্মী। ক্ষুধার জন্যে কাঁদছে না পেট ব্যাথায় কাঁদছে সেটা বুঝা যায় না। তিন চার মাস বয়সে কান্নার ধরনে পরিবর্তন আসে। এই কান্না থেকে তার কন্ঠনালীর পেশীসমূহ পরিপক্কতা লাভ করে। এ সময় কান্নার উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট ভাবে বুঝা যায়। চার মাসে শিশু কিছু অর্থহীন শব্দাংশ উচ্চারন করে। শিশু মা বা অন্য কোন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির কোলে উঠলে আনন্দিত ও তৃপ্ত হয়ে এধরনের শব্দ করে। দুধ খাওয়ার পরেও অনেক শিশুকে এধরনের শব্দ করতে শোনা যায়। শিশুর এই কূজন বা (Cooing) কে ভাষার উৎস বলা হয়। উ,উ,বা,বা,তা-তা এ ধরনের বিভিন্ন শব্দে শিশু কুজন করে। এই শব্দাংশ সে পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। অনেকে এটাকে (Babbling) বলেন। এতে স্নায়ুতন্ত্রের গঠন সুদৃঢ় হয়। তার স্বরধ্বনি পরিষ্কার হতে থাকে।
ছয় মাস বয়সে শিশু যে শব্দগুলো শুনে সেগুলোর প্রতি মনোযোগী হয় এবং অনুকরণ করতে চেষ্টা করে। শিশু শব্দ ব্যবহার করার আগেই পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায়। মাকে দেখে হাত পা নেড়ে উঁ আঁ শব্দ করে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। ৬ মাসের পর নানা ধরনের ধ্বনি ও শব্দের উচ্চারণ সে অন্যদের অনুকরণে করে থাকে। নয় দশ মাসে সে শোনা শব্দ বার বার উচ্চারণ করে। এটা হচ্ছে ভাষা শেখার অনুকরণ ও পুনরাবৃত্তির পর্যায়। ৭/৮ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর কলকূজন উদ্দেশ্যহীন ও অর্থহীন। কিন্তু নিজের শব্দে আনন্দিত হয়ে সে ধ্বনির পুনরাবৃত্তি করে। ৯/১০ মাসে শিশু অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের শব্দ করে। ১২/১৩ মাসের শিশু সহজ কয়েকটি শব্দ উচ্চারণ করতে পারে। নিজের চাহিদা প্রকাশ করার উপযোগী ভঙ্গি ও শব্দ করতে পারে। সাধারণ ভাবে এ সময় শব্দ ব্যবহার করে। মায়ের মত মহিলাদের মা বলে। ক্রমে সে আমার মা, তোমার বাবা ইত্যাদি বুঝতে পারে। এই পর্যায়ে সে ভাষার বিকাশের অর্থবোধের পর্যায়ে এসে পৌছায়। এক একটি শব্দ দিয়ে সে ভাব প্রকাশ করে। যেমন, বোতল দেখিয়ে বলে 'দুধ' ইত্যাদি। এ সময়ে স্পষ্ট ভাবে কথা বলার আগে কথার অর্থ বুঝতে পারে। "খেলনা কোথায়" বললে সে খেলনা দেখাতে পারে।
১২-১৮ মাসের শিশু একটি বক্যের পরিবর্তে একটি শব্দ ব্যবহার করে অবস্থা বুঝায়। দুই বছরে দুটি বা তিনটি শব্দ দিয়ে মনোভাব প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু বাক্য শুদ্ধ বা সম্পর্ন হয় না। তিন বছর বয়সে স্বাভাবিক শিশু পূর্ণ বাক্য সঠিক ভাবে বলতে পারে। ২-৩ বছরের মধ্যে মোটামুটি ভাবে মনের ভাব প্রকাশ করার উপযোগী ভাষা তার শেখা হয়ে যায়। শিশুর প্রথম সামাজিক ভাষায় প্রশ্নের ব্যবহার থাকে। এটা কি,ওটা কি, কেন, কোথায় ইত্যাদি প্রশ্ন করে। অনেক কিছু জানতে চায় ও নিজের ধারণা ভাষায় প্রকাশ করতে শিখে। ৩ বছর উত্তীর্ণ শিশু সব ধরণের শব্দ ব্যবহার করতে পারে, ৭/৮ শব্দের ব্যাক্য বলতে পারে। স্কুলগামী শিশুর ভাষার বিকাশ খুব দ্রুত হয়। শব্দ ভান্ডারও দ্রুত বাড়তে থাকে। ব্যাক্য গঠনও জটিলতর হতে থাকে। এটা ভাষার বিকাশের লিখন-পঠন পর্যায়।