শিশুর সাথে ভুল আচরণ ও তাকে শোধরানোর উপায়
Table of Content:
আমার ছোট বোনের বয়স ৮। ছোট থেকে ঠিক মতো প্যারেন্টিং না পাওয়ায় ও এখন তারবিয়্যাহর কিছু গ্যাপ রেয়ে গেছে। এখানে আমাদের ভুল জানি। আগে ও এমন ছিলো না। প্রায় সময় কথা না শোনার কারণে আমি ওর উপর রাগ হয়েছি। মাঝে মাঝে অতিরিক্ত দুষ্টামি করার জন্য ওকে মেরেছি। কিন্তু এখন আমি আর ওকে মারতে চাই না আমি অনুতপ্ত আমার এই ভুলগুলোর কারণে। তবে এখন ওকে আর ভালোমতো কোন কথা বললে শুনতে চায় না। উল্টো এখনো আমার উপরেই জেদ দেখায়, ওর সাথে আমার মোটামুটি একটা দূরত্ব চলে এসেছে যে কারন ও আমার কোন কথাই শুনতে চায় না এখন ওকে কিভাবে ঠিক করা যায়।
শিশুর শৈশবকালীন বেড়ে ওঠার পেছনে প্যারেন্টিং এবং পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভুল পদ্ধতিতে লালন-পালন শিশুর মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদি কোনো কারণে শিশুর সাথে ভুল আচরণ করে থাকেন, তবে এটি সংশোধন করা সম্ভব। এখানে ধাপে ধাপে কিছু কৌশল দেওয়া হলো যা শিশুর মনোভাব পরিবর্তন করতে সাহায্য করবে।
১. সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করুন
শিশুর সাথে দূরত্ব তৈরি হলে প্রথমে সম্পর্ককে নতুনভাবে গড়ে তোলা জরুরি। শিশুকে বোঝাতে হবে যে আপনি তাকে ভালোবাসেন এবং তার মঙ্গলের জন্যই কিছু বলছেন।
✔ দুঃখ প্রকাশ করুন: যদি অতীতে আপনি রাগ করে শিশুকে মেরেছেন বা কড়া কথা বলেছেন, তাহলে সরাসরি তার কাছে ক্ষমা চান। বলুন, "আমি আগে রেগে গিয়ে তোমাকে ভুল করেছি, আমি দুঃখিত।" শিশুর প্রতি আন্তরিকতা দেখালে সে সহজেই আপনার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করবে।
✔ বন্ধুত্ব গড়ে তুলুন: শিশুর পছন্দের কাজগুলোতে অংশ নিন। তার সাথে খেলাধুলা করুন, গল্প বলুন বা ছবি আঁকার মতো সৃজনশীল কাজে সময় দিন। এতে সে ধীরে ধীরে আপনার প্রতি আগ্রহী হবে।
২. কথার ধরন বদলান
শিশুর আচরণ পরিবর্তনের জন্য তার সাথে কেমনভাবে কথা বলা হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ।
✔ আদেশমূলক কথা পরিহার করুন: "তুমি এটা করো, ওটা করো" বলার বদলে "আমরা যদি এটা করি, তাহলে কেমন হয়?" এই ধরনের বাক্য ব্যবহার করুন। এতে শিশুর ওপর চাপ পড়বে না এবং সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আপনাকে অনুসরণ করবে।
✔ শিশুকে সিদ্ধান্ত নিতে দিন: ছোট ছোট বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করুন – "আজ তুমি কোন রঙের জামা পরতে চাও?" বা "আমরা কোন গল্প পড়ব?" এর ফলে সে নিজের গুরুত্ব অনুভব করবে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
৩. ভালোবাসার মাধ্যমে সংশোধন করুন
শিশুর আচরণ শুধরে দিতে হলে কঠোরতা নয়, ভালোবাসা এবং প্রশংসার মাধ্যমে তার মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে।
✔ শাস্তি ও মারধর পুরোপুরি বাদ দিন: শাস্তি শিশুকে বিদ্রোহী করে তোলে এবং সে আপনার প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি করতে পারে।
✔ ভালো কাজে উৎসাহ দিন: যখন সে ভালো কিছু করে, তখন প্রশংসা করুন। যেমন: "তুমি দারুণ একটা কাজ করলে! আমি খুব খুশি।" এতে শিশুর মধ্যে ভালো কাজ করার আগ্রহ বাড়বে।
✔ তার অনুভূতি বুঝতে চেষ্টা করুন: শিশুর রাগ বা দুঃখ প্রকাশের কারণ বোঝার চেষ্টা করুন এবং তাকে শান্তভাবে উত্তর দিন। এতে সে নিজেকে মূল্যবান মনে করবে।
৪. ধৈর্য ধরুন এবং নিয়মিত দোয়া করুন
শিশুর আচরণ রাতারাতি পরিবর্তন হবে না। এজন্য ধৈর্য ধরে ধাপে ধাপে তাকে বোঝাতে হবে।
✔ ধৈর্য হারাবেন না: শিশুর মধ্যে পরিবর্তন আনতে সময় লাগবে। কোনো পরিবর্তন দেখতে না পেলেও ধৈর্য ধরতে হবে।
✔ তার জন্য দোয়া করুন: ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে, দোয়া খুবই শক্তিশালী মাধ্যম। শিশুর জন্য দোয়া করুন যেন সে সঠিক পথে চলতে পারে।
৫. ইসলামিক তারবিয়্যাহ সহজভাবে শেখান
শিশুর মধ্যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গড়ে তোলার জন্য ইসলামিক শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
✔ নবী (সা.)-এর গল্প বলুন: শিশুদের কাছে কঠোর ভাষায় নীতিশিক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে নবী (সা.)-এর জীবনী থেকে গল্প শোনান। এতে সে সহজেই ভালো গুণগুলো গ্রহণ করবে।
✔ দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে শিক্ষা প্রবেশ করান: সরাসরি শিখানোর পরিবর্তে দৈনন্দিন কাজের মধ্য দিয়ে তাকে মূল্যবোধ শেখান। যেমন খাবার খাওয়ার সময় বিসমিল্লাহ পড়ানো বা কারো প্রতি সদয় আচরণ করার গুরুত্ব বোঝানো।
সংক্ষেপে করণীয়
১. সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করুন (দুঃখ প্রকাশ করুন, বন্ধুত্ব তৈরি করুন)। 2. কথার ধরন বদলান (কঠোর আদেশ নয়, বরং উপদেশ ও পরামর্শ দিন)। 3. ভালোবাসা ও প্রশংসার মাধ্যমে সংশোধন করুন। 4. ধৈর্য ধরুন ও দোয়া করুন। 5. ইসলামিক শিক্ষা সহজভাবে উপস্থাপন করুন।
শিশুর মানসিক বিকাশ ও আচরণগত পরিবর্তন আনতে এই কৌশলগুলো অনুসরণ করলে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।