কু প্রবৃত্তির খপ্পর থেকে মুক্তির উপায়
Table of Content:
কু প্রবৃত্তির খপ্পর থেকে মুক্তির উপায়
মানুষের অন্তর মাত্রই পাপ কল্পনা আসতে পারে। এটা অন্যায় নয়। কিন্তু এ কল্পনা লালন করাই বড় অন্যায়। আর পৃথিবীর অপরাধ জগতের সিংহ ভাগই এই উৎস থেকে উৎসারিত। তাই কল্পনা আসা মাত্রই তা থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে হবে। অন্তর থেকে মুছে ফেলতে হবে তার ছাপশুদ্ধ। আমাদের শ্রদ্ধেয় মুরুব্বী ডাঃ আব্দুল হাই (রঃ) এই পাপ কল্পনা থেকে উত্তরণের একটি পথ বাতলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মনোরাজ্যে যখন গুনাহের কাজ করার কল্পনা আসে তখন আল্লাহকে স্মরণের মাধ্যমে তাকে তাড়িয়ে দাও। যদি এতে সেই কল্পনা তাড়িত না হয় বরং ক্রমশঃ ঝড়ো হাওয়ার রূপ পরিগ্রহ করতে থাকে, তাহলে চক্ষু বন্ধ করে কিছুক্ষণ তোমার পারিবারিক ও সামাজিক পরিমন্ডলে বিচরণ কর। মনকে জিজ্ঞেস কর- যদি এখন আমার পিতা-মাতা আমার সামনে থাকেন তাহলে কি আমি তাদের সামনে এ ধরণের গর্হিত কাজে লিপ্ত হতে পারবো? যদি আমার উস্তাদ আমার সামনে থাকেন তাহলে কি আমি তাঁর সামনে এ ধরণের কাজ করতে পারবো? যদি এখন আমাদের সমাজপতি এখানে উপস্থিত থাকেন তাহলে কি আমি তার সামনে এ কাজে লিপ্ত হতে পারবো? যদি একান্ত অবাধ্য হয়ে বা চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে এ কাজে জড়িয়েই পড়ি তাহলে তারা আমাকে ফি গরণের শাস্তি দিতে পারেন? দেখবে, তখন অবশ্যই অবশ্যই মনো মুকুর থেকে কল্পনার দাগশুদ্ধ মুছে যাবে। তারপর চিন্তা কর এরা দেখলে হয়তো সাময়িক ভাবে আমাকে ভর্ৎসনা করবে। বড়জোর কিছু উত্তম-মধ্যমও দিবে। কিন্তু এরপর আর কোন খবরও থাকবেনা। অথচ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে যদি আমি এ কাজে লিপ্ত হই তাহলে কি তিনি আমাকে সাময়িক শান্তি দিবেন, না চিরস্থায়ী? আর সে শাস্তি কি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রীয় পরিসরে সীমিত, না হযরত আদম থেকে নিয়ে কেয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের সামনে দেয়া হবে? তিনি বলেন, আশা করা যায় যে, এ ভাবে চিন্তা করলে আল্লাহর রহমতে গুনাহ থেকে বেঁচে. থাকা যাবে।
প্রবৃত্তি আমাদের অন্তরের এমন একটি প্রভাবশালী দিক, যা মানুষকে পাপ ও অন্যায়ের দিকে ধাবিত করে। প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলেও এটি সম্ভব। ইসলামী শিক্ষার আলোকে নিচে কয়েকটি উপায় উল্লেখ করা হলো, যা প্রবৃত্তির খপ্পর থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করবে:
আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং তাকওয়া অর্জন করা
- আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস এবং তাকওয়া (ভয়ভীতি) অর্জন করা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার মূল চাবিকাঠি।
- কুরআনে বলা হয়েছে:
“আর যে তার প্রতিপালকের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করে এবং প্রবৃত্তিকে দমন করে, জান্নাতই তার ঠিকানা।” (সূরা আন-নাযিয়াত: ৪০-৪১)
২. ইবাদতের প্রতি মনোযোগ বাড়ানো
- নিয়মিত নামাজ আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, দোয়া করা এবং জিকির করা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
- নামাজ মানুষকে পাপ ও অশ্লীলতা থেকে দূরে রাখে।
৩. আত্মশুদ্ধি অনুশীলন করা
- প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আত্মশুদ্ধির চর্চা করতে হবে। এটি অন্তরকে পবিত্র এবং প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম করে।
- কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“নিশ্চয়ই সফল হয়েছে সেই ব্যক্তি, যে আত্মাকে পবিত্র করেছে।” (সূরা আশ-শামস: ৯)
৪. মনের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা
- মনের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে নিজেকে এমন পরিবেশে রাখতে হবে যেখানে পাপের প্রলোভন কম থাকে।
- খারাপ সঙ্গ এড়িয়ে চলা এবং ভালো সঙ্গ বেছে নেওয়া এতে সাহায্য করবে।
৫. রোজা রাখা
- রোজা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তিশালী উপায়। এটি আত্মাকে সংযম শেখায় এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সাহায্য করে।
- নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“রোজা ঢালস্বরূপ, যা তোমাকে পাপ থেকে রক্ষা করে।” (সহীহ বুখারি)
৬. নিজের ত্রুটি স্বীকার করা এবং তাওবা করা
- নিজের ভুল-ত্রুটি স্বীকার করে আল্লাহর কাছে তাওবা করা এবং ক্ষমা চাওয়া প্রবৃত্তি দমন করার একটি কার্যকর উপায়।
- কুরআনে বলা হয়েছে:
“যারা অন্যায় কাজ করার পর সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, তাদের জন্য আল্লাহ ক্ষমাশীল।” (সূরা আলে ইমরান: ১৩৫)
৭. দুনিয়ার মোহ কমানো
- প্রবৃত্তি প্রায়ই দুনিয়ার মোহ থেকে জন্ম নেয়। তাই দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ কমিয়ে আখিরাতের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে হবে।
- নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“দুনিয়া হলো মুমিনের কারাগার এবং কাফেরের জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম)
৮. অধৈর্য ও ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করা
- প্রবৃত্তি প্রায়ই ক্রোধ ও অধৈর্য থেকে জন্ম নেয়। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে প্রবৃত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
৯. দায়িত্বশীল হওয়া
- নিজের কর্মের জন্য দায়বদ্ধ হওয়া এবং নিজেকে আত্মসমালোচনা করা প্রবৃত্তিকে দমন করতে সহায়ক।
১০. আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা
- জীবনের সব ভালো কিছুর জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে প্রবৃত্তি দমিত হয় এবং আত্মা প্রশান্ত হয়।
উপসংহার:
প্রবৃত্তি থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হলেও এটি সম্ভব। একমাত্র আল্লাহর সাহায্য এবং ইসলামী নির্দেশনা মেনে চলার মাধ্যমেই প্রবৃত্তিকে দমন করা সম্ভব। নিয়মিত ইবাদত, আল্লাহর স্মরণ এবং আত্মশুদ্ধির চর্চা প্রবৃত্তির খপ্পর থেকে মুক্তির উপায়।