টিনেজ বয়সের মানসিক অবস্থা ও সমস্যার সমাধান
Table of Content:
টিনেজ বয়সের মানসিক অবস্থা বুজতে পারছিনা। কোনো কথা শুনতে চায় না। কোনো কাজই শেষ করতে পারে না। সবকিছু পেনডিং রেখে দেয়। পরে আর করতে পারে না কেন? মায়ের সাথে রিলেশন ও খারাপ হয়ে যাচ্ছে ডে বাই ডে। এভয়েড করে চলে কেন এমন টা হচ্ছে? ওকে দেখে ছোট বেবিটাও তাকে ফলো করছে?
টিনেজ বয়সের মানসিক অবস্থা ও সমস্যার সমাধান
টিনেজ বয়স এমন একটি সময়, যখন শিশু থেকে একজন ব্যক্তি ধীরে ধীরে পরিপক্ক হওয়ার পথে থাকে। এই সময়টা তাদের জন্য যেমন জটিল, তেমনি অভিভাবকদের জন্যও চ্যালেঞ্জিং। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেন যে, টিনেজাররা কোনো কাজ শেষ করতে চায় না, সবকিছু পেন্ডিং রেখে দেয়, কথা শুনতে চায় না, এবং পারিবারিক সম্পর্কেও পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে মা-বাবার সাথে সম্পর্ক দূরে সরে যেতে থাকে।
এমন পরিস্থিতিতে কড়া শাসন বা শুধুমাত্র উপদেশ দিয়ে কাজ হবে না, বরং তাদের মানসিক অবস্থা বুঝে যথাযথ কৌশল প্রয়োগ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। এই আর্টিকেলে আমরা টিনেজ বয়সের মানসিক পরিবর্তন, সমস্যার কারণ, এবং কিভাবে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়, তা বিশদভাবে আলোচনা করব।
টিনেজারদের মানসিক পরিবর্তনের কারণ
১. মস্তিষ্কের অসম্পূর্ণ বিকাশ
টিনেজ বয়সে মস্তিষ্কের prefrontal cortex (যেটি সিদ্ধান্ত নেওয়া, পরিকল্পনা করা, ও আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করে) পুরোপুরি বিকশিত হয় না। ফলে তারা গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো শেষ করতে পারে না, এবং সবকিছু পেন্ডিং রেখে দেয়।
২. স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা
এই বয়সে তারা নিজেদের মতো চলতে চায়। তারা মনে করে, সবকিছুতে মা-বাবার হস্তক্ষেপ তাদের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করছে। তাই অনেক সময় তাদের সাথে বেশি কথা বললেই তারা বিরক্ত হয়ে যায়।
৩. ইমোশনাল আপ-ডাউন
টিনেজ বয়সে শরীরে হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে তাদের মুড স্বাভাবিকভাবেই ওঠানামা করে। কখনো তারা বেশি আনন্দিত থাকে, আবার হঠাৎ বিষণ্ণ হয়ে যায়। এজন্য তারা কখনো খুব ভালো ব্যবহার করে, আবার কখনো হঠাৎ করে মা-বাবাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে।
৪. সামাজিক ও ডিজিটাল আসক্তি
সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও গেমস, এবং বিনোদনমূলক অন্যান্য মাধ্যম তাদের বাস্তব জীবনের কাজের প্রতি মনোযোগ কমিয়ে দেয়। ফলে তারা মূল দায়িত্বগুলো এড়িয়ে চলে।
৫. পারিবারিক সম্পর্কের পরিবর্তন
টিনেজ বয়সে তারা মনে করতে থাকে যে মা-বাবা তাদের বুঝতে চান না বা তাদের মতামতের মূল্য দেন না। এজন্য তারা পরিবারের সঙ্গে কম সময় কাটাতে চায় এবং বন্ধুবান্ধবের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
টিনেজারদের সংশোধনের উপায়
এখন প্রশ্ন হলো, কিভাবে তাদের বোঝানো ও সংশোধন করা যায়? নিচে ধাপে ধাপে বিস্তারিত কৌশল দেওয়া হলো।
১. কড়া শাসনের পরিবর্তে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন
অনেক অভিভাবক মনে করেন, বকাঝকা বা শাসন করলেই টিনেজাররা ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু এটি ভুল ধারণা।
✅ তার কথা শুনুন এবং অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করুন।
✅ কখনো সরাসরি কঠোরভাবে আদেশ দেবেন না। বরং জিজ্ঞেস করুন,
👉 "তুমি এত বিরক্ত কেন? আমি তোমার জন্য কী করতে পারি?"
✅ তাকে মনে করিয়ে দিন যে, সে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং তার মতামত মূল্যবান।
২. গাইডলাইন দিন, তবে স্বাধীনতাও দিন
টিনেজ বয়সীরা সবকিছু নিজে করতে চায়। কিন্তু একেবারে স্বাধীনতা দিলে তারা ভুল পথেও যেতে পারে। তাই তাদের গাইডলাইন দেওয়া দরকার, তবে তা যেন আদেশের মতো শোনায় না।
✔ ভালো উপায়:
👉 "তুমি কখন এটা শেষ করতে চাও?"
👉 "তুমি যদি এটা শেষ করো, তাহলে তোমার পছন্দের কাজ করতে পারবে।"
এতে সে মনে করবে, কাজটি করা তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত।
৩. তার জন্য ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন
বড় কাজ একবারে করতে বলা হলে টিনেজাররা হতাশ হয়ে পড়ে। তাই কাজ ভাগ করে দিন।
✔ ভুল পদ্ধতি:
👉 "একসাথে পুরো পড়া শেষ করতে হবে!"
✔ সঠিক পদ্ধতি:
👉 "তুমি আজ শুধু ১৫ মিনিট পড়বে।"
এতে মানসিক চাপ কমবে এবং কাজটি সহজ মনে হবে।
৪. ডিজিটাল আসক্তি কমিয়ে আনুন
টিনেজাররা মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া, এবং ভিডিও গেমসে প্রচুর সময় ব্যয় করে। একদম নিষেধ করলে তারা বিরোধিতা করবে, তাই ব্যালান্স করুন।
✔ কী করবেন?
✅ কাজ শেষ করার পর মোবাইল ব্যবহারের অনুমতি দিন।
✅ পারিবারিক একটিভিটিতে তাকে যুক্ত করুন।
৫. পারিবারিক সম্পর্ক মজবুত করুন
টিনেজ বয়সে মা-বাবার সাথে দূরত্ব বাড়তে পারে। তাই সম্পর্ক মজবুত করাটা জরুরি।
✔ তাকে বেশি ভালোবাসা ও গুরুত্ব দিন।
✔ তার পছন্দ-অপছন্দের বিষয়ে জানতে চান।
✔ তাকে সময় দিন এবং তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করুন।
৬. ছোট ভাইবোনের জন্য পজিটিভ রোল মডেল বানান
যদি ছোট ভাই বা বোন তাকে ফলো করে, তবে তাকে বোঝান যে সে পরিবারের বড় সদস্য, এবং তার দায়িত্ব আছে।
✔ তাকে ছোট ভাই বা বোনকে শেখানোর জন্য উৎসাহিত করুন।
✔ এতে সে দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে।
সংক্ষেপে মূল উপায়:
✅ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন।
✅ কাজ ভাগ করে ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
✅ ডিজিটাল আসক্তি কমান এবং সময় ব্যবস্থাপনা শেখান।
✅ পরিবারের প্রতি তার গুরুত্ব বোঝান এবং দায়িত্বশীল বানান।
✅ ধৈর্য ধরুন ও ভালোবাসা দিয়ে পরিবর্তন আনুন।
শেষ কথা
টিনেজ বয়সে ধৈর্য ও সঠিক কৌশল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি নিয়মিতভাবে এসব কৌশল প্রয়োগ করেন, ইনশাআল্লাহ ধীরে ধীরে তার আচরণ পরিবর্তন হতে শুরু করবে।