উত্তর: মৃত ব্যক্তির কবরের পাশে কুরআন তিলাওয়াত করা বা বর্তমান সমাজে প্রচলিত 'কুরআন খানি'র আয়োজন সম্পর্কে ইসলামি উৎসসমূহের বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. সুন্নাহর অনুসরণ: নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী, নবি করিম (সা.) বা তাঁর সাহাবীগণ কখনো দাফনের পর কবরের পাশে বসে কুরআন খতম বা কুরআন পাঠ করেননি [৪৫২, ৪৭৩]। কবর জিয়ারতের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ছিল কেবল সালাম দেওয়া, মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা এবং আখেরাতকে স্মরণ করা [৪৫২, ৪৬৯]।
২. মালেকীয় মাযহাবের মত: মালেকী মাযহাবের প্রসিদ্ধ আলেম শাইখ ইবনে আবী হামযা (রহ.) এবং শাইখ দারদীরের মতে, কবরের পাশে কুরআন পাঠ করা মাকরুহ বা অপছন্দনীয় এবং এটি একটি বিদআত বা নতুন উদ্ভাবিত আমল; কারণ এটি সালাফে সালেহীন বা পূর্ববর্তী নেককারদের রীতি ছিল না [৪৬৯]।
৩. শাফেয়ী মাযহাবের মত: ইমাম শাফেয়ী (রহ.) কুরআনুল কারীমের সূরা নাজম-এর ৩৯ নম্বর আয়াতের ("মানুষ কেবল তাই পায় যা সে করে") আলোকে অভিমত দিয়েছেন যে, কুরআন পাঠের সওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায় না [৪৭০]। তবে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দোয়া ও দান-সদকার সওয়াব পৌঁছানোর বিষয়ে সহীহ হাদিস রয়েছে [৪৫৯, ৪৬১]।
৪. কুরআন খানি ও পারিশ্রমিক: দাফনের পর বা নির্দিষ্ট দিনে (৩ দিন বা ৪০ দিন) লোক জমায়েত করে হাফেজ বা কারী সাহেবদের মাধ্যমে অংকের বিনিময়ে কুরআন খতম করানোকে শরীয়তে ভিত্তিহীন ও বিদআত বলা হয়েছে [৪৩৫, ৪৩৬, ৪৭৩]। ইবাদতের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ বা প্রদান করা ইসলামে বৈধ নয় [৪৩৫]।
৫. হাদিসের ব্যাখ্যা: অনেকে "তোমরা তোমাদের মৃতদের ওপর সূরা ইয়াসীন পাঠ করো" হাদিসটির ওপর ভিত্তি করে কুরআন পাঠের কথা বলেন; তবে আলেমদের মতে এই হাদিসের বর্ণনাসূত্র অত্যন্ত দুর্বল (মুজতারেব) এবং এর অর্থ মূলত মরণাপন্ন বা মুমূর্ষু ব্যক্তির পাশে পড়া [৪৭১]।
সারসংক্ষেপে, মৃত ব্যক্তির কল্যাণের জন্য কুরআন খানির চেয়ে তাঁর জন্য ব্যক্তিগতভাবে দোয়া করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং দান-সদকা করা অনেক বেশি কার্যকর ও সুন্নাহসম্মত [৪৫২, ৪৫৭, ৪৬১]।
এই উত্তরের তথ্যসূত্রসমূহ: ১. আব্দুল্লাহিল হাদী আব্দুল জলীল রচিত "মৃত্যু ও কবর সম্পর্কে করণীয় ও বর্জনীয়", প্যাসেজ ইনডেক্স: (৪৩৫, ৪৩৬, ৪৫২, ৪৫৭, ৪৫৯, ৪৬১, ৪৬৯, ৪৭০, ৪৭১, ৪৭৩)।